ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার জেরে মধ্যপ্রাচ্যের আকাশপথ কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন দেশ শনিবার বিকাল থেকে তাদের আকাশসীমা বন্ধ ঘোষণা করে। এর প্রভাব সরাসরি পড়েছে বাংলাদেশেও। চলমান সংঘাত ও বাড়তে থাকা নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে ঢাকা থেকে মধ্যপ্রাচ্যগামী একের পর এক ফ্লাইট বাতিল করা হচ্ছে। বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) ৩৪টিসহ ৬ দিনে বিভিন্ন এয়ারলাইন্সের মোট ২১০ ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) সহকারী পরিচালক (জনসংযোগ) মুহাম্মদ কাউছার মাহমুদ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, যুদ্ধপরিস্থিতিতে আকাশপথ বন্ধের কারণে ঢাকা থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি ২৩টি, ১ মার্চ ৪০টি ফ্লাইট, ২ মার্চ ৪৬টি, ৩ মার্চ ৩৯টি এবং ৪ মার্চ ২৮টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। ফ্লাইট বাতিলের কারণে মধ্যপ্রাচ্যগামী যাত্রীরা চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। অনেকেরই দিন কাটছে বিমানবন্দরে। কবে যাত্রা সম্ভব হবে, টিকিট রিশিডিউল বা রিফান্ড কীভাবে মিলবে-এসব প্রশ্নে দিশেহারা তারা। একইভাবে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত বাংলাদেশিরাও বিপাকে পড়েছেন। আকাশসীমা বন্ধ এবং অধিকাংশ এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট স্থগিত থাকায় দেশে ফিরতে পারছেন না তারা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত ফ্লাইট স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা কম। এ অবস্থায় দেশে আটকে পড়ায় অনেক প্রবাসীর ভিসার মেয়াদ শেষ হচ্ছে। তাদের তথ্য সংগ্রহ ও আবেদন গ্রহণ করছে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়। তাদের বিষয়ে বিবেচনা করতে সংশ্লিষ্ট দেশকে অনুরোধ করা হয়েছে। এরই মধ্যে সাড়া দিয়েছে কাতার ও আমিরাত। দুবাইয়ে আটকে পড়া মাজেদুল ইসলাম বলেন, ব্যবসার কাজে গত মাসে এখানে এসেছি। এমিরেটসের ফ্লাইটে আমার দেশে ফেরার টিকিট কাটা ছিল। কিন্তু ফ্লাইট বাতিল হওয়ায় এখন আর ফিরতে পারছি না। কবে দেশে যেতে পারব, সেটিও বলতে পারছি না। প্রবাসীকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক নুর বলেন, যাদের ভিসার মেয়াদ সন্নিকটে বা মেয়াদ শেষ হয়ে যেতে পারে, সেসব কর্মীর ব্যাপারে বিবেচনা করতে দূতাবাসের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে অনুরোধ জানানো হয়েছে।
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এসএম রাগীব সামাদ বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের আকাশসীমা বন্ধ থাকায় নিরাপত্তা ঝুঁকি বিবেচনায় ইরান, ইরাক, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, কাতার ও জর্ডান সাময়িকভাবে তাদের আকাশসীমা বন্ধ ঘোষণা করেছে। এর ফলে গত পাঁচ দিনে বিভিন্ন এয়ারলাইন্সের ১৭৬টি ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে। তবে এ সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি রুটে সীমিতসংখ্যক ফ্লাইট ঢাকা ছেড়েছে। যাত্রীদের সংশ্লিষ্ট এয়ারলাইন্সের সঙ্গে যোগাযোগ করে ফ্লাইটের সর্বশেষ অবস্থা নিশ্চিত হয়ে তবেই বিমানবন্দরে আসার অনুরোধ জানান তিনি।
সূত্রমতে, সর্বশেষ বুধবার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বাতিল হয়েছে ২৮টি ফ্লাইট। এর মধ্যে রয়েছে কাতার এয়ারওয়েজের ৪টি, এমিরেটস এয়ারলাইন্সের ৫টি, কুয়েত এয়ারওয়েজের ২টি, জাজিরা এয়ারওয়েজের ২টি, এয়ার অ্যারাবিয়ার ৮টি, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ৩টি এবং ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের ৪টি। এর আগে ঢাকা থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি ২৩টি, ১ মার্চ ৪০টি, ২ মার্চ ৪৬টি এবং ৩ মার্চ ৩৯টি ফ্লাইট বাতিল হয়। ফ্লাইট বাতিলের কারণে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন মধ্যপ্রাচ্যগামী প্রবাসী কর্মীরা। ছুটি শেষে কর্মস্থলে ফিরতে না পেরে অনেকেই দীর্ঘ সময় বিমানবন্দরে অপেক্ষা করছেন। বাতিল হওয়া ফ্লাইটের নতুন টিকিট ইস্যু বা রিফান্ড পাওয়া নিয়েও তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।
বুধবার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ঘুরে দেখা গেছে, বাতিল হওয়া ফ্লাইটের যাত্রীরা টার্মিনালে অপেক্ষা করছেন। সবার চোখেমুখে উৎকণ্ঠা ও অনিশ্চয়তার ছাপ। দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পরও সুনির্দিষ্ট তথ্য না পাওয়ায় যাত্রীদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। ফেনী থেকে ঢাকায় এসেছেন ইয়ার আলী। এমিরেটসের সন্ধ্যা ৬টা ৪৫ মিনিটের ফ্লাইটে তার যাত্রার কথা ছিল। কিন্তু বিমানবন্দরে এসে জানতে পারেন, ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। তিনি যুগান্তরকে বলেন, ‘আমাকে শুধু বলা হয়েছে ফ্লাইট বাতিল। আগে যদি মোবাইল ফোনে বার্তা পাঠানো হতো, তাহলে এত কষ্ট করে বাড়ি থেকে আসতে হতো না। এখন বলা হচ্ছে গুলশানে এয়ারলাইন্সের অফিসে যেতে। বিকাল সাড়ে ৪টায় সেখানে গিয়ে কী করব? অফিস তো বন্ধ হয়ে গেছে।’ আরেক যাত্রী তফাজ্জল হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘বিমানবন্দরে এসে যদি শুনি ফ্লাইট বন্ধ, তাহলে সেটা আমাদের জন্য বড় ভোগান্তি। এজেন্সির সঙ্গে যোগাযোগ করলে একেক সময় একেক তথ্য দেয়। কেউ পরিষ্কারভাবে কিছু বলছে না।’
বাংলাস্কুপ/প্রতিবেদক/এনআইএন